সবার সুস্থতা কামনা করি মহামারি ও নববর্ষ

এবারের পয়লা বৈশাখ এল বড় এক জাতীয় দুর্যোগের মধ্যে। কোভিড–১৯ নামের এক নতুন ভাইরাস মহামারি আকারে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরাও এর বাইরে নই। এ দেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৩৯ জন; সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ৮০৩ জনের। দুটি সংখ্যাই প্রতিদিন বাড়ছে এবং সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভাইরাসটির বিস্তার রোধ করার জন্য লকডাউন চলছে। ফলে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কাজকর্ম বন্ধ। জীবিকার সংকটে পড়েছেন বিপুল সংখ্যক নিম্ন আয়ের মানুষ, তাঁদের কষ্ট হচ্ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে শুরু হয়েছে খাদ্যাভাব। সব মিলিয়ে আমরা এমন এক সময় পার করছি, যখন আনন্দ–উৎসব উদ্‌যাপনের সুযোগ নেই। কিন্তু আমাদের জীবনে পয়লা বৈশাখ তো আসে নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যয় নিয়ে। ১৪২৭ বঙ্গাব্দের এই প্রথম প্রভাতে আমরা বরাবরের মতোই নতুন আশা ও স্বপ্ন বুকে ধারণ করে সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই, সবার সুস্থতা কামনা করি। পয়লা বৈশাখের উৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর সর্বজনীনতা। করোনা–দুর্যোগের এই সময়ে এই সর্বজনীনতার প্রকাশ ঘটুক জাতীয় ঐক্য, সংহতি, সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে। এই গভীর সংকট মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সবার দায়িত্বশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা। সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার প্রয়াসের মধ্য দিয়ে আমরা অন্যদেরও সেই ঝুঁকির বাইরে রাখতে পারি। সে জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে; পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে, বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও অন্যান্য জীবাণুনাশক ব্যবহার করতে হবে। মুখে মাস্ক পরতে হবে। প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সারার ক্ষেত্রে অন্য যেকোনো ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। বিদেশফেরত ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার প্রয়োজনীয়তা ভুললে চলবে না। পরিবারের কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে সতর্কতার সঙ্গে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার শর্তগুলো মেনে চলতে হবে। করোনা–দুর্যোগ শুধু আমাদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও উদ্বেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; জাতীয় জীবনের অন্য সব দিকেও এর গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ শুধু সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতসহ গোটা সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। অর্থনৈতিক অচলাবস্থার ফলে জনজীবনে যে নেতিবাচক প্রভাব প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠছে, তার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠী। এবারের বর্ষবরণের দিনে তাঁদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, পারস্পরিক সংস্পর্শ যথাসম্ভব এড়িয়ে ক্ষুধার্ত মানুষদের, বিশেষত শিশুদের খাদ্যসাহায্য পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাব। পয়লা বৈশাখে কমিউনিটি পর্যায়ে সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তি, সংস্থা, প্রতিষ্ঠানগুলো এমন উদ্যোগ নিলে এবারের বর্ষবরণ ভিন্ন রকমের এক ইতিবাচক মাত্রা পেতে পারে। আর যেহেতু ভাইরাসের আরও বিস্তার এড়ানোর জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিকল্প নেই, তাই এবারের পয়লা বৈশাখে আসুন, আমরা নিজ নিজ ঘরে থাকি। করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে সারা পৃথিবীর মানুষের আশু মুক্তি কামনার মধ্যে ১৪২৭ বঙ্গাব্দকে বরণ করি। এই দুর্যোগ কেটে যাক। নতুন স্বপ্ন ও প্রত্যয় নিয়ে শুরু হোক নতুন এক কর্মময় বছর।